রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন পেয়েছি:এনবিআর চেয়ারম্যান

নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিবছরের ৩০ নভেম্বর ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ দিন।এর পরে রিটার্ন জমা দিলে একজন করদাতাকে গুনতে হয় জরিমানা। সেই সঙ্গে বিনিয়োগে রেয়াতের সুবিধাও পান না। কম হারে কর দেওয়ার সুযোগও থাকে না। করমুক্ত আয়ের সুবিধাও হারাতে হয়।কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয়ও করযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমার পরিমাণ খুবই কম হওয়ায় এরই মধ্যে দুই দফায় দুই মাস সময় বাড়িয়েছে এনবিআর। সেই সময়ও প্রায় শেষের দিকে। করদাতারা তাঁদের কর জমা না দেওয়ায় আরেক দফা সময় বাড়িয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি করার কথা ভাবছে সরকার।

সময় বাড়ানো প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন শেষ সময়ে দিনে এক-দুই লাখ করে রিটার্ন জমা হতে পারে।আমরা রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন পেয়েছি। তবে এখন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’

অনলাইন রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হলেও ই-রিটার্ন সার্ভারের দুর্বলতা ও কারিগরি জটিলতায় ভোগান্তিতে পড়েছেন করদাতারা। নিবন্ধন ও লগ ইনে সমস্যা, মোবাইল ফোনে ওটিপি পেতে দেরি, আগের বছরের রিটার্ন আপলোড না হওয়া এবং একই তথ্য একাধিকবার ইনপুট দিতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর সঙ্গে অনলাইন রিটার্ন ব্যবস্থায় অনভ্যস্ততা ও অর্থনৈতিক চাপ যোগ হয়ে অনেক করদাতাই রিটার্ন দাখিল থেকে সরে যাচ্ছেন। ফলে জানুয়ারির শেষ প্রান্তে এসে জমা পড়েছে মাত্র ৩৪ লাখ রিটার্ন।

এনবিআরের তথ্য বলছে, দেশে এই মুহূর্তে নিবন্ধিত করদাতা আছেন এক কোটি ২৩ লাখ। রিটার্ন জমা দিয়েছেন ৩৩ লাখ ৯১ হাজার ৫৮৪ জন। সে হিসাবে এখনো প্রায় ৯০ লাখ করদাতা রিটার্ন জমা দেননি। গত বছরে মোট রিটার্ন জমা পড়েছিল ৪৫ লাখ। সে সময় তিন দফা সময় বাড়িয়ে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের রিটার্ন দাখিলের সময় ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করা হয়েছিল। চলতি করবর্ষে এনবিআরের আশা, আগের বছরের তুলনায় রিটার্ন জমার পরিমাণ বাড়বে।

তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক করদাতাই জানিয়েছেন তাঁদের সমস্যার কথা। ই-রিটার্ন সার্ভারে নিবন্ধন নিতে করদাতার বায়োমেট্রিক করা মোবাইল নাম্বার দরকার হয়। তবে সার্ভার দুর্বলতার কারণে অনেক সময়ই এই সার্ভারে ঠিকমতো ঢুকতে পারছেন না করদাতারা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মোবাইল নাম্বারে ওটিপি আসার কথা থাকলেও অনেক সময়েই তা আসছে সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর। তখন আবার নতুন করে প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়।

নতুন করদাতা হলে তিনি তার তথ্য দিয়ে রিটার্ন ফরম পূরণ করবেন। অন্যদিকে পুরনো করদাতার ক্ষেত্রে অভিযোগ আছে, আগের বছরে কাগুজে রিটার্ন জমা দিলেও তার আইডিতে তথ্য আপলোড করা হয়নি। সে ক্ষেত্রে আগের বছরের রিটার্ন জমা দেওয়ার কপি সংগ্রহ করতে দৌড়াচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলে।

নতুন-পুরনো করদাতা নির্বিশেষে তাঁর সঞ্চয়পত্র, এফডিআর বা ডিপিএস থাকলে সেই তথ্য উল্লেখ করতে হচ্ছে পৃথক পৃথক চারটি জায়গায়। এসব বিনিয়োগ একজন করদাতার জন্য সম্পদ। উদাহরণস্বরূপ—একজন করদাতা যদি সঞ্চয়পত্র কিনে থাকেন তিনি সম্পদ ও দায় সেকশনে গিয়ে ‘আর্থিক পরিসম্পদ’ ঘরটি নির্বাচন করবেন। সেখানে সঞ্চয়পত্রের নাম, ক্রয়ের তারিখ, ক্রয়মূল্য, প্রাপ্ত সুদ ও কেটে নেওয়া করের পরিমাণ উল্লেখ করবেন।

একই তথ্য আবার সম্পদ বিবরণীর ‘বিনিয়োগ’ কলামে দেখাতে হবে। এসব বিনিয়োগ থাকলে আমানতকারী তাঁর আমানতের বিপরীতে একটি অঙ্ক মুনাফা পাচ্ছেন। এই মুনাফার টাকা তাঁর বিগত বছরের আয় হিসেবে বিবেচিত। তাই আয়ের ঘরে এই মুনাফার টাকা উল্লেখ করতে হচ্ছে। এসব মুনাফার বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট অংশ ব্যাংক উৎস কর হিসেবে আগেই কেটে নিয়েছে। সেই টাকার পরিমাণ কত, তা আলাদাভাবে আবার উল্লেখ করতে হবে, যাতে উৎস করের পরিমাণ প্রদেয় করের সঙ্গে সমন্বয় করা যায়।

যদিও একই তথ্য বারবার বিভিন্ন কলামে বসানোর বিষয়টি বেশির ভাগ করদাতার জন্য খুবই কঠিন। তাই সঠিক তথ্য দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও অনেকেই দিতে পারছেন না। ফলে আবার তাঁকে ‘রিভার্স রিটার্ন’ অপশন খুঁজে নিতে হচ্ছে। সাধারণত রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে করদাতা কোনো ভুল করলেই তাঁকে রিভার্স রিটার্ন দিতে হয়।

ইউনিলিভার বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, ‘বাংলাদেশের অনলাইন কর রিটার্ন দাখিল ব্যবস্থা বিভ্রান্তিকর ও কঠিন। উন্নত দেশগুলোতে কর রিটার্ন দাখিল তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও বাংলাদেশে এ অভিজ্ঞতা এখনো কষ্টসাধ্য।’

কর অঞ্চল-৭-এর করদাতা সালমা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনলাইন রিটার্নে একই তথ্য কয়েক জায়গায় উল্লেখ করতে হয়, এ বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না। এতে করে আমার রিটার্নের তথ্যে ভুল হয়েছে। এখন রিভার্স রিটার্ন জমা দেব। অনলাইনে রিটার্ন জমার প্রক্রিয়া আরো সহজ হওয়া উচিত।’

আয়কর নথি প্রস্তুত করতে হলে একজন করদাতার আগের বছরের রিটার্ন জমা দেওয়ার কপি প্রয়োজন হয়। তবে গত বছর বাধ্যতামূলক না থাকায় অনেকে কাগুজে পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা দিয়েছিলেন। তাঁরা চলতি বছরে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় দেখছেন, আগের বছরের হালনাগাদ তথ্য অনলাইনে আপলোড হয়নি। এ জন্য আবার দৌড়াতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলে।

কর অঞ্চল-২৩-এর করদাতা মো. সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনলাইনে রিটার্ন বাধ্যতামূলক করায় নিবন্ধন নিয়েছি। তবে আগের বছর কাগুজে রিটার্ন জমা দেওয়ায় অনলাইনে সেই তথ্য পাচ্ছি না। তাই সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলে দৌড়াতে হচ্ছে।’

এক বছরের বেশি সময় ধরে বেকার গাজী টায়ারসের একজন কর্মকর্তা। কয়েক জায়গায় চাকরির আশায় ঘুরলেও তাঁর চাকরি হয়নি। আগে নিয়মিত করদাতা হলেও এখন তাঁর কর দেওয়ার সক্ষমতা নেই। এমন মানুষের সংখ্যা অনেক। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ২১ লাখ মানুষ, যাঁদের বেশির ভাগই আর নতুন করে চাকরি পাননি। এতেও কর আদায়ের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রভাব পড়েছে।

এ ছাড়া অনলাইন সিস্টেম হওয়ার পরও ব্যাংক হিসাবের তথ্য ইনপুট দিতে হচ্ছে। অথচ এই তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চলে আসতে পারত। কারণ টিআইএন, ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র বা অন্য কোনো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবেই উল্লেখ করতে হয় ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য। সরকারের অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে আন্তঃসংযোগের বিষয়ে এনবিআর কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে কি না জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘এসব বিষয় নিয়ে কাজ চলছে। আস্তে আস্তে এসব হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *