করদাতাদের আয়, ব্যয় ও সম্পদ ট্র্যাকিংয়ে ডেটাভিত্তিক ব্যবস্থার পরিকল্পনা এনবিআরের।এ পরিকল্পনায় রয়েছে জিডিপিতে করের অনুপাত ৬.৮% থেকে বাড়িয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫%-এ উন্নীত করার লক্ষ্য। কর ফাঁকি শনাক্ত ও রাজস্ব আদায় বাড়াতে, করদাতাদের ঘোষিত আয়ের সঙ্গে তাদের প্রকৃত আয়-ব্যয় ও অর্জিত সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্যহীনতা খুঁজে বের করতে এক ডেটাভিত্তিক বা উপাত্তনির্ভর সমন্বিত ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই ব্যবস্থার অধীনে, প্রতিটি করদাতার একটি 'ইন্টিগ্রেটেড' বা সমন্বিত প্রোফাইল তৈরি করা হবে। এতে করদাতার আয়কর রিটার্নে ঘোষিত আয়ের সঙ্গে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে খরচ, বিদেশ ভ্রমণ, ব্যাংক লেনদেন, গাড়ি ক্রয়, শেয়ারবাজারের বিনিয়োগ এবং অন্যান্য স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ক্রয়-বিক্রয় বা ব্যবহারের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে দেখা হবে। নতুন এই প্রযুক্তি করদাতার আয়, ব্যয় ও সম্পদের মধ্যে সংগতি রয়েছে কি না—তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যায়ন করবে। যদি এতে বড় ধরনের কোনো গরমিল পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট করদাতাকে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ (হাই-রিস্ক) ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এনবিআর আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে করদাতাদের এই সমন্বিত প্রোফাইল সম্পন্ন করা এবং একটি শক্তিশালী 'ইনকাম ট্যাক্স ডেটা ওয়্যারহাউস' স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। এর পাশাপাশি উচ্চ সম্পদসম্পন্ন ব্যক্তির (হাই-নেট-ওয়ার্থ ইন্ডিভিজ্যুয়াল) অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে তাঁদের কর প্রদানের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে তাঁদের পৃথক প্রোফাইল তৈরি করা হবে। গতকাল অর্থমন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে, এ পরিকল্পনাসহ রাজস্ব আয় বাড়াতে এনবিআরের আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগ থেকে পৃথক পৃথক পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন কর্মকর্তারা। বৈঠকের কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। বৈঠকে আগামী তিন মাস থেকে শুরু করে পরবর্তী পাঁচ বছর পর্যন্ত মোট ছয় মেয়াদের সময়সীমা নির্ধারণ করে নিজ নিজ কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করে এনবিআরের বিভাগগুলো। গত অর্থবছর ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করেছে এনবিআর। চলতি অর্থবছর সংস্থাটির জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করেছে বিএনপি সরকার। উপস্থাপিত কর্মপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিদ্যমান ৬.৮ শতাংশ থেকে স্বল্পমেয়াদে আরও দুই শতাংশ পয়েন্ট বাড়ানো, মধ্যমেয়াদে এটি ১০ শতাংশে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা। অর্থপাচার রোধে বিদেশে কাস্টমস অ্যাটাশে পদ তৈরির প্রস্তাব বাণিজ্যিক জালিয়াতি, রাজস্ব ফাঁকি এবং বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার (ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং) রুখতে প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতে 'কাস্টমস অ্যাটাশে' পদ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে এনবিআর। সংস্থাটি জানিয়েছে, কেবল দেশীয় উপাত্ত দিয়ে এ ধরনের ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ফলে প্রস্তাবিত কাস্টমস অ্যাটাশেরা আমদানিকৃত পণ্যের উৎস, রপ্তানিকারকের বিস্তারিত পরিচয়, বাণিজ্যিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট বিদেশি কোম্পানি সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে ভূমিকা রাখবেন। করদাতার প্রোফাইলে যেসব তথ্য থাকবে করদাতার অটোমেটেড আয় ও সম্পদ প্রোফাইলে যেসব তথ্য থাকবে, তার মধ্যে- ঘোষিত আয় ও আয়করের পরিমাণ, ব্যাংক লেনদেন, স্থাবর সম্পত্তি, কোম্পানির মালিকানা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ, উইথহোল্ডিং ট্যাক্স, বিদেশ ভ্রমণের তথ্য, ব্যাংক হিসাব ও বড় অংকের লেনদেন, বাড়ি-জমি ও ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়, গাড়ির মালিকানা, উচ্চ মূল্যের ইউটিলিটি কানেকশন, ভাড়া থেকে আয় এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়। উদাহরণ হিসেবে এনবিআর বলেছে, কোন করদাতার ঘোষিত আয়ের পরিমাণ ১২ লাখ টাকা, কিন্তু তার ব্যাংকে জমা আছে ১.২০ কোটি টাকা, গাড়ি ক্রয় ৫০ লাখ টাকা, জমি ক্রয় ১ কোটি টাকা এবং বিদেশ ভ্রমণ বছরে ৫ বার। এ ধরণের অসঙ্গতি ন্যাশনাল ইনকাম ট্যাক্স ডেটা ম্যাচিং সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করবে। এতে ডেটাভিত্তিক এনফোর্সমেন্ট সম্ভব হবে। কর্পোরেট আয়কর ফাঁকি রোধের উপায় কর্পোরেট আয়কর ফাঁকি বন্ধ করতে নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক সূচক সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনার জন্য একটি সিস্টেম-ভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে থাকবে কোম্পানির টার্নওভার বনাম ঘোষিত মুনাফা, গ্রস প্রফিট রেশিও, রিলেটেড-পার্টি ট্রান্সজেকশনস, সুদের খরচ, ব্যবস্থাপক ফি, রয়্যালটি, কমিশন, অবচয়, মন্দঋণ, রিলেটেড-পার্টি লোন, পরিচালকদের সম্মানী, আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যের বিপরীতে স্থানীয় বাজারে বিক্রি, ভ্যাট টার্নওভার বনাম আয়কর টার্নওভার। কর্পোরেট আয়কর ফাঁকি কমাতে একই খাতের কোম্পানিগুলোর জন্য ইন্ডাস্ট্রি বেঞ্চমার্ক তৈরির কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে বলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে এনবিআর। প্রধান প্রধান শহরে সক্রিয় করদাতা রেজিস্ট্রি বড় শহরগুলোতে সম্পত্তিভিত্তিক আয়কর কমপ্ল্যায়েন্স প্রোগ্রাম চালু করবে এনবিআর। এর ফলে বাড়ি, ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি থেকে রাজস্ব আহরণ বাড়বে বলে মনে করছে এনবিআর। টিআইএন ডেটাবেসেই ক্লিনসিং ও সক্রিয় করদাতার রেজিস্ট্রি তৈরি করার পরিকল্পনা তুলে ধরে এনবিআর বলেছে, যারা নিয়মিত রিটার্ন ও কর দেন তাদের সক্রিয় করদাতা (অ্যাকটিভ ট্যাক্সপেয়ার) হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। আর যারা রিটার্ন দেন কিন্তু কর দেন না, তাদের পৃথক শ্রেণীতে রাখা হবে। এছাড়া, টিআইএন থাকলেও রিটার্ন দেন না, দীর্ঘদিন ধরে রিটার্ন দেন না এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থাকলেও টিআইএন নেই– এমন ব্যক্তিদের পৃথকভাবে তালিকা করা হবে। প্রতিবছর অ্যাকটিভ ট্যাক্সপেয়ার গ্রোথ টার্গেট নির্ধারণ করা হবে। প্রতিটি ট্যাক্স অফিস কতজন নতুন সক্রিয় করদাতা সৃষ্টি করেছে, তা মূল পারদর্শীতার সূচক বা কেপিআই হিসেবে বিবেচিত হবে। বকেয়া কর আদায়ে ইনকাম ট্যাক্স ডেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে এনবিআর জানিয়েছে। করদাতার সঙ্গে কর্মকর্তার অপ্রয়োজনীয় সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে আনতে, ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট ও ফেসলেস অডিট কার্যক্রম ধাপে ধাপে গ্রহণ করবে এনবিআর। কর কর্মকর্তা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অ্যাসেসমেন্ট বা পর্যালোচনা সম্পন্ন করবেন। তিন বছরের মধ্যে সমন্বিত করদাতা অ্যাকাউন্ট আগামী তিন মাসের মধ্যে এনবিআর তাদের টিআইএন ডাটাবেস পরিচ্ছন্ন ও শ্রেণিবদ্ধ করবে, শীর্ষ বকেয়া আয়কর তালিকা তৈরি এবং উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানি ও উচ্চ-সম্পদশালী ব্যক্তিবর্গকে শনাক্ত করবে। আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে করদাতাদের রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করতে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হবে, 'হাই-নেট-ওয়ার্থ ইন্ডিভিজ্যুয়াল ইউনিট' আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হবে এবং কেন্দ্রীয় ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা পাইলটিং বা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হবে। ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে করদাতাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সম্পত্তি, যানবাহন ও কোম্পানির তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংযুক্ত করা হবে এবং স্বয়ংক্রিয় আয়-সম্পদ প্রোফাইলিংয়ের পাইলটিং শুরু করা হবে। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক অডিট সিলেকশন ও অটোমেটেড উইথহোল্ডিং লেজার ব্যবস্থাও এই সময়ে প্রস্তুত করা হবে। এক থেকে দুই বছরের মধ্যে প্রি-ফিল্ড (পূর্বেই পূরণকৃত) আয়কর রিটার্ন, দেশব্যাপী ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট এবং স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত বা রিফান্ড ব্যবস্থা চালু করা হবে। একই সাথে মাঝারি স্তরের করদাতাদের বিভাগ পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক কর নির্ধারণ ব্যবস্থার (ট্রান্সফার প্রাইসিং) সক্ষমতা জোরদার করা হবে। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সমন্বিত করদাতা অ্যাকাউন্ট প্রতিষ্ঠা, তৃতীয় পক্ষের সম্পূর্ণ ডেটা ক্রস-ম্যাচিং, ইনকাম ট্যাক্স ডেটা ওয়্যারহাউস স্থাপন, আয়-সম্পদের গরমিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্তকরণ, করের ব্যবধান (ট্যাক্স গ্যাপ) নিরূপণ এবং আধুনিক ডেটা অ্যানালিটিক্সনির্ভর আইনি প্রয়োগ জোরদার করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এনবিআর। বন্দরে জট কমাতে দ্রুত নিলামের উদ্যোগ চট্টগ্রাম বন্দরসহ দেশের বন্দরগুলোতে অখালাসকৃত ও বাজেয়াপ্ত পণ্য দ্রুত নিলামের মাধ্যমে বিক্রি নিশ্চিত করে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে কাস্টমস। এনবিআর জানিয়েছে, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে আদায়যোগ্য বকেয়ার পরিমাণ ২৫,০০০ কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া বন্ডেড সুবিধাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আগামী বছরগুলোতে কর অব্যাহতি সুবিধা আরও যৌক্তিকীকরণ করার প্রস্তাব তুলে ধরেছে এনবিআর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৭৭,১৬০ কোটি টাকা কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। দুর্বল কমপ্ল্যায়েন্স, অপযাপ্ত অটোমেশন, মিস ইনভয়েসিং এবং অর্থপাচার প্রতিরোধে ট্যাক্স গ্যাপ অ্যানালাইসিস, এনবিআর-ওয়াইড ইন্টিগ্রেটেড অটোমেশন ও তথ্য সমন্বয়, এআই এন্ড মেশিন লার্নিং বেইজড স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করা হবে। এ বিষয়ে বক্তব্য চেয়ে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সংসদীয় কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ কমিটির অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংসদ সচিবালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বৈঠকে অংশ নেন।