রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদের অনুমোদন পাওয়া উচিত বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও রাজস্ব খাত বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অধ্যাদেশটি পাস না হলে আগের মতোই অনিয়ম-দুর্নীতি চলবে। রাজস্ব খাতে কোনো উন্নতি হবে না। লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব হবে না। তাই সরকারের উচিত দেশের স্বার্থে কিছু সংশোধন এনে হলেও অধ্যাদেশটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়া।
তবে এমন পর্যবেক্ষণের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন গত বছর এই অধ্যাদেশে পরিবর্তন আনার দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেওয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের একাংশ। তারা বলছেন, অধ্যাদেশটি যৌক্তিক নয় বলেই এটি বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন না করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। এতে প্রতীয়মান হয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন সঠিক ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরে বিভিন্ন বিষয়ে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশ জারির পর তা পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করতে হয় এবং ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হলে তা বাতিল হয়ে যায়। যে কারণে এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে রিপোর্ট পেশের জন্য ১৩ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি করা হয়েছে।
ওই কমিটি রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ জাতীয় সংসদে এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরবর্তী সময় যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করেছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে (১২ এপ্রিল) এ-সম্পর্কিত নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। সে ক্ষেত্রে এই অধ্যাদেশ দুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যেতে পারে।
এ সম্পর্কিত অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যাওয়া ঠিক হবে না বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ। জানতে চাইলে গতকাল সমকালকে তিনি বলেন, এখনই অধ্যাদেশটি বাতিল বলা যাবে না, স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে এই অধ্যাদেশটি রাজস্ব খাতের জন্য খুবই প্রয়োজন। ব্যবসায়ী ও অংশীজনের দীর্ঘ সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশটি প্রণয়ন করেছিল। বিশ্বের বহু দেশেই রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ আলাদা। এ ধরনের উদ্যোগে সফলতা না থাকলে ওই দেশগুলো তা বাস্তবায়ন করত না।
অর্থনীতিবিদ মাসরুর রিয়াজ বলেন, বর্তমান সরকার যদি কিছু সংযোজন-বিয়োজন করেও অধ্যাদেশটি বিল আকারে সংসদে উপস্থাপনের পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তা সরকারের জন্যই মঙ্গলজনক হবে। কারণ বাজেট বাস্তবায়নের জন্য রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিকল্প নেই। আর নীতি ও বাস্তবায়ন একই বিভাগের অধীনে থাকলে আগের মতোই অনিয়ম হবে, রাজস্ব আদায়ে ব্যাঘাত ঘটবে, তাতে ঘাটতি বাড়তে থাকবে।
অধ্যাদেশটি বাতিল হলে রাজস্ব খাতে ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতা আরও বাড়বে বলে মনে করেন এনবিআর সংস্কারের জন্য গঠিত পরামর্শক কমিটির সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন। তিনি বলেন, রাজস্ব সংস্কার নিয়ে গঠিত কমিটি যে সুপারিশ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে তা যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। অর্থাৎ সুপারিশের অনেক কিছু বাদ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকার সংস্কার কমিটির পূর্ণাঙ্গ সুপারিশকে মূল্যায়ন করে পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে বিল আকারে এটি অনুমোদনের উদ্যোগ নিলে তা দেশের জন্য ভালো হবে।
এনবিআরের সাবেক এই সদস্য বলেন, এই অধ্যাদেশ যদি পুরোপুরি বাতিল হয়ে যায় তাহলে তা দেশের জন্য ভবিষ্যতে খুবই খারাপ হবে। কারণ যিনি নীতি প্রণয়ন করবেন তিনিই যদি সেই নীতির বাস্তবায়ন করেন, তাহলে সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকবে না। ক্ষমতার অপব্যবহার হবে। স্বেচ্ছাচারিতা বাড়বে।
তবে এনবিআরের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী গত বছরের মে ও জুন মাসে আন্দোলনে অংশ নেন তাদের কেউ কেউ সংসদীয় কমিটির সুপারিশকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ‘সেটা ছিল যৌক্তিক আন্দোলন। কারণ যাদের শুল্ক-কর সংক্রান্ত বিষয়ে বিশদ জ্ঞান নেই, তারাও এনবিআরের দুই বিভাগের প্রধান হতে পারবেন– এমন সুযোগ রেখে অধ্যাদেশটি করা হয়েছিল।’
ভ্যাট ও শুল্ক বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আন্দোলনের সময় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছিলেন, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বিএনপির সংশ্লিষ্টতা নেই। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তখন যুক্তরাজ্য থেকে আন্দোলনকারীদের পক্ষে সংহতি জানিয়েছিলেন।’ এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘অধ্যাদেশটি বাতিল করা উচিত। আর সেজন্যই হয়তো তারেক রহমানের সরকার সে পথে হাঁটছে। এটি বাতিল হলে বোঝার বাকি থাকে না যে, বিগত সরকার তখন অন্যায়ভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শাস্তি দিয়েছিল।’
Source: Samakal