জমির বাজারমূল্যে দিতে হবে ‘সম্পদ কর’

সারচার্জের পরিবর্তে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ‘সম্পদ কর’ আরোপ করতে যাচ্ছে সরকার। দলিল মূল্যের পরিবর্তে জমির বাজার (মৌজা) মূল্যের ওপর কর আদায় করা হবে। রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, বারিধারা, চট্টগ্রামের খুলশী ও আগ্রাবাদসহ বিভাগীয় শহরের অতি ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে নেওয়া হচ্ছে এই উদ্যোগ। এর ফলে কর ন্যায্যাতা সৃষ্টির পাশাপাশি বৈষম্য হ্রাস পাবে বলে ধারণা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ইতোমধ্যে সম্পত্তি ও সম্পদ কর আইন প্রণয়ন ও বিধির খসড়া প্রস্তুত করেছে সংস্থাটি।

বিদ্যমান আয়কর আইন অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর (বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, কৃষি ও অকৃষি জমি) সম্পদের মূল্য ৪ কোটি টাকার বেশি হলে সারচার্জ দিতে হয়। এছাড়াও নিজ নামে একাধিক গাড়ি বা ৮ হাজার বর্গফুটের অধিক আয়তনের গৃহ সম্পত্তি থাকলেও সারচার্জ দিতে হয়। অবশ্য সম্পদের পরিমাণ বেশি হলে সারচার্জও বেশি দিতে হয়। যেমন-নিট সম্পদের মূল্য ৪ কোটি টাকার বেশি, কিন্তু ১০ কোটি টাকার কম হলে ১০ শতাংশ; সম্পদের মূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি, কিন্তু ২০ কোটি টাকার কম হলে ২০ শতাংশ; সম্পদের মূল্য ২০ কোটি টাকার বেশি, কিন্তু ৫০ কোটি টাকার কম হলে ৩০ শতাংশ এবং সম্পদের মূল্য ৫০ কোটি টাকার বেশি প্রদেয় করের ৩৫ শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হয়।

সারচার্জ দিতে হয় প্রদেয় করের ওপর। অর্থাৎ একজন করদাতা যত টাকা আয়কর দিচ্ছেন, তার ভিত্তিতে সারচার্জ আদায় করা হয়। উদাহরণস্বরূপ-‘ক’ নামক ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ ৫ কোটি টাকা। তিনি বছরে আয়কর দেন এক লাখ টাকা। এই এক লাখ টাকা ওপর ১০ শতাংশ হারে তাকে ১০ হাজার টাকা সারচার্জ হিসাবে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৯৬ কোটি টাকা সারচার্জ আদায় করেছে এনবিআর। এর আগের দুই অর্থবছরের তথ্য এনবিআরের সংরক্ষণ করেনি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫০ হাজার ৫৩ জন করদাতা ৬৯৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা সারচার্জ দিয়েছেন। ২০২১-২২ অর্থবছরে সারচার্জ দিয়েছিলেন ১৪ হাজার ৮৫৪ জন করদাতা। আদায় হয়েছিল ৬২৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৯১৯ জন করদাতা ৫৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা সারচার্জ দিয়েছেন। চলতি অর্থবছরে সারচার্জের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করছে এনবিআর।

বাজেটসংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, রাজস্ব আদায় বাড়াতে এবং প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার মাধ্যমে বৈষম্য কমাতে সারচার্জের পরিবর্তে সম্পদ কর আরোপের চিন্তা-ভাবনা চলছে। প্রাথমিকভাবে একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের গ্রিন সিগন্যাল পেলে এটি আইন আকারে এটি বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

নতুন নিয়মে, সম্পদের সীমা একই থাকবে। শুধু বদলে যাবে কর গণনার পদ্ধতি। যেমন-চার কোটি টাকা থেকে ১০ কোটি টাকার মধ্যে সম্পদ থাকলে তাকে সম্পদমূল্যের শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ ‘সম্পদ কর’ দিতে হবে। দশ কোটির বেশি, কিন্তু ২০ কোটির কম হলে এক শতাংশ; ২০ কোটির বেশি, কিন্তু ৫০ কোটির কম হলে এক দশমিক ৫০ শতাংশ ও ৫০ কোটির বেশি হলে দুই শতাংশ ‘সম্পদ কর’ কর দিতে হবে। এক্ষেত্রে সম্পদের মূল্য নির্ধারিত হবে বাজারভিত্তিক বা মৌজামূল্যে। তবে এই সম্পদ কর কোনোভাবেই করদাতার প্রদেয় করের চেয়ে বেশি হবে না। ফলে সম্পদ কর কারও জন্য বোঝা তৈরি করবে না। বরং কর ন্যায্যতা তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। যুগান্তরকে এমন তথ্য জানিয়েছেন কয়েকজন কর কর্মকর্তা। তারা এ প্রসঙ্গে উদাহরণ দিয়ে বলেন-যেমন একজন ব্যক্তির বার্ষিক আয়কর হিসাব করে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ টাকা। একই ব্যক্তির সম্পদ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে আনুমানিক ৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিনি এনবিআর কর্তৃক নির্ধারিত নতুন সম্পদ করের প্রথম ধাপ বা স্লাবের মধ্যে আছেন। এখানে তাকে সম্পদ কর হিসাবে দিতে হবে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ তার সম্পদ কর দাঁড়াবে ৩ লাখ টাকা। এখানে যেহেতু বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির প্রদেয় করের চেয়ে তার সম্পদ কর বেশি হবে না, সেহেতু তিনি ১ লাখ টাকা আয়কর প্রদান করায় তার জন্য সম্পদ করও নির্ধারণ করা হবে ১ লাখ টাকা। ফলে তাকে সরকারকে মোট দিতে হবে ২ লাখ টাকা। এছাড়া যেহেতু সম্পদ কর পাশ হওয়ার সময় সারচার্জ প্রথা বাতিল করা হবে, সেহেতু তাকে আর সারচার্জও দেওয়া লাগবে না।

যেভাবে রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে : সম্পদ কর দুভাবে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। প্রথমত, ন্যূনতম প্রদেয় করের সমান কর দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, দলিল মূল্যের পরিবর্তে মৌজামূল্যে নির্ধারণ করা হলে সম্পদ করের আওতা বাড়বে। বর্তমানে দলিল মূল্যের ওপর সারচার্জ আদায় করায় রাজধানীর অভিজাত এলাকার অতি ধনী অনেক ব্যক্তি করের আওতার বাইরে থাকছে।

উদাহরণস্বরূপ-‘ক’ নামক ব্যক্তিকে আগে ১০ হাজার টাকা সারচার্জ দিতে হতো। নতুন নিয়মে তাকে মোট সম্পদ মূল্যের ওপর দশমিক ৫০ শতাংশ হারে সম্পদ কর দিতে হবে। এ নিয়মে তার আড়াই লাখ টাকা সম্পদ কর দেওয়ার কথা। যেহেতু প্রদেয় করের বেশি সম্পদ কর হবে না, সেহেতু ‘ক’ নামক করদাতাকে এক লাখ টাকা সম্পদ কর দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোনো ব্যক্তি ৯০-এর দশকে গুলশানে ১০ লাখ টাকা দরে ৮০ লাখ টাকায় ৮ কাঠা জমি কিনেছেন। বিদ্যমান পদ্ধতিতে তাকে সারচার্জ দিতে হয় না। বর্তমানে গুলশানে আবাসিক প্লটের মৌজামূল্য প্রায় এক কোটি টাকার কাছাকাছি। সে হিসাবে তার সম্পদের মূল্য দাঁড়ায় ৮ কোটি টাকা। বিধায় নতুন নিয়মে ওই ব্যক্তিকে সম্পদ কর দিতে হবে।

এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, উন্নত বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই সম্পদ করের প্রচলন আছে। সেসব দেশে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি সম্পদ কর হিসাবে আদায় করা হয়। যেমন-যুক্তরাষ্ট্রে জিডিপির ৩ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ৪ দশমিক ২০ শতাংশ, কানাডা ৩ দশমিক ১০ শতাংশ, ফ্রান্স ও দক্ষিণ কোরিয়া ৪ শতাংশ, জাপান ২ দশমিক ৮০ শতাংশ, স্পেন ২ দশমিক ৫০ শতাংশ ও সুইজারল্যান্ড ২ দশমিক ১০ শতাংশ সম্পদ করের মাধ্যমে আদায় করে। যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পদ কর আদায় সম্ভব।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ যুগান্তরকে বলেন, কর ন্যায্যতার প্রেক্ষাপটে যার আয় ও সম্পদ বেশি তার করের বোঝা বেশি হওয়া উচিত। এই প্রেক্ষাপটে সম্পদ কর আরোপ রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও বৈষম্য হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সম্পদের ভ্যালুয়েশন পদ্ধতি যেন সর্বজন গৃহীত হয়, সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। কেননা বাংলাদেশের কর সংস্কৃতি অনেক দুর্বল। জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়া হলে সম্পদ গোপনের প্রচেষ্টা শুরু হতে পারে। এতে অর্থনীতিতে অপ্রদর্শিত অর্থের আকার বাড়তে পারে।

Source: Jugantor

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *