আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার যা চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের তুলনায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রস্তুত হওয়া এই বাজেটে দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বাজেট যেন বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য হয় তার ওপর জোর দিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
আগামী অর্থবছরের বাজেটের যে আকার নির্ধারণ করা হয়েছে সেটি একেবারে চূড়ান্ত নয়। বাজেটের আকারে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা অনেক বেশি। সদ্য দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকার যদি মনে করে বাজেটে পরিবর্তন-পরিমার্জন হতে পারে । আর রাজনৈতিক সরকার তা করেও থাকে। তবে বর্তমান কাঠামোর মধ্যে থেকেই অর্থ বিভাগ ত্রিপক্ষীয় বৈঠকগুলো করছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে আগামী বাজেটে বরাদ্দ নির্ধারণে কিছু সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারী ও শিশু উন্নয়ন এবং জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলায় সহায়ক কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে । একই সঙ্গে এমন কার্যক্রমে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে যা সরকারের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে সরাসরি সহায়ক হবে।
অর্থ বিভাগের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের প্রাক্কলন এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অনুমোদিত ব্যয়সীমার মধ্যে থাকে। অপচয় কমানো এবং জবাবদিহি নিশ্চিতে বাজেটে কোনো ধরনের থোক বরাদ্দ না রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বাজেটের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া এই বাজেট যেন মানুষের বাস্তব উন্নয়নে ভূমিকা রাখে এবং বাস্তবায়নযোগ্য হয় সেই নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে আগামী বাজেটে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে এই বিষয়গুলো বাজেটে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বরাবরের মতো গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে যাতে এসব খাতের মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।
বাজেট কাঠামো
দেশে এ যাবৎ ৫৪টি বাজেট দেওয়া হয়েছে। এবার ৫৫তম বাজেটে দিতে যাচ্ছে সদ্য গঠিত বিএনপি সরকার। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতি বছরই বাজেটের আকার একটু একটু করে বড় হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেটের আকার ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা।
আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে ৬ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা যা জিডিপির ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৫ লাখ ৬৪১ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও পরে সংশোধন করে তা ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।
আগামী বাজেটে ৬ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের মধ্যে রাজস্ব খাত থেকে আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে ৫ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা যা জিডিপির ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এটি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্ব খাতের প্রস্তাবিত বাজেটর তুলনায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা বেশি আর সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরে আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৫ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা আর সংশোধিত লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের কর রাজস্ব নির্ধারণ করা হতে পারে ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা যা জিডিপির ৮ দশমিক ১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের জন্য এনবিআরের কর বহির্ভূত রাজস্ব লক্ষ্য হতে পারে ২১ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ) যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ২০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারিত আছে।
আগামী অর্থবছরের জন্য নন-ট্যাক্স রেভিনিউ (এনটিআর) খাতের লক্ষ্যমাত্রা ৬৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে (জিডিপির ১ শতাংশ)। এটি চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও ৪৬ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির থেকে ২৩ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা বা জিডিপির ৩ দশমিক ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হচ্ছে। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপি থেকে ৫৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা।
সরকার যেভাবে আগামী অর্থবছরের জন্য আয়-ব্যয় নির্ধারণ করতে যাচ্ছে তাতে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা বা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছিল ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা পরে তা শংশোধন করে ২৬ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ২ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে।
আগামী অর্থবছরের ঘাটতি অর্থায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ২ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ২ শতাংশ) সংগ্রহ করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংক থেকে ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে আসবে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছর ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য থাকলেও পরে তা
সংশোধন করে ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। আর ব্যাংক থেকে প্রথমে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার লক্ষ্য থাকলে পরে সংশোধন করে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য থাকলেও সংশোধিত বাজেটে তা ৪০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৬১ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হতে পারে। চলতি অর্থবছর প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৫ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হলেও পরে সংশোধিত বাজেটে তা ৫ শতাংশ করা হয়।
আগামী বাজেটে জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা ৬৮ লাখ ৭০৭ কোটি টাকা (৫৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) নির্ধারণ করার সম্ভাবনা রয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে জিডিপির পরিমাণ নির্ধারণ আছে ৬১ লাখ ২১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা (৫০২ বিলিয়ন ডলার)।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্নীতি, অপচয় এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে স্বাস্থ্য খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হচ্ছে না। চিকিৎসা ও সেবার মান অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমুখী। দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের দিক থেকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। ফলে ব্যক্তির পকেট থেকে ব্যয় কমাতে এই খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।
অন্যদিকে শিক্ষা খাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন হলেও দেশে তা ২ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এতে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, দেশে দুর্নীতি কমেনি এবং দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগে স্থবিরতা রয়েছে। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগ এক শতাংশের নিচে নেমে প্রায় শূন্য দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায় না।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে অনেক বিনিয়োগকারী অপেক্ষার অবস্থানে রয়েছে যা কর্মসংস্থানের জন্য উদ্বেগজনক। কারণ বিনিয়োগই কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান চালিকাশক্তি।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকেও নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ব্যবসায়ী মহল বলছে, বিনিয়োগ পরিবেশে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই ধীরগতি রয়েছে যা অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
গণ-অভ্যুত্থানে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে আবার অনেক সম্ভাবনাময় শিল্প অর্থাভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ঋণ প্রাপ্তির জটিলতা, সুদের হার বৃদ্ধি এবং অর্থায়ন সংকট ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে সার্বিকভাবে বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করছেন তারা।
এফবিসিসিআইএর সাবেক সভাপতি এবং বর্তমান সরকারে এক মন্ত্রী বলেন, যে পরিবেশ-পরিস্থিতিতে একটা দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় সেটা দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত। এখন নির্বাচন হয়েছে পরিস্থিতি কী হয় দেখা যাক।
তার মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন দেখবে দেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতেছে তখন তারাও আস্তে আস্তে আসবে। না হয় বিদেশি যেগুলো আছে এগুলো কেমনে চলে যাবে সেই চিন্তা করবে।